সময়েরঘটনা
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ

শার্শায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সোনামুখো বিলে ১৫ কোটি টাকার মাছ নিধন!

A

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট, ২০২৬

আপডেট: ২ মিনিট আগে

শার্শায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সোনামুখো বিলে ১৫ কোটি টাকার মাছ নিধন!

অক্সিজেন সংকটে পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে উঠেছে নিঃস্ব খামারি, দিশেহারা শত পরিবার

যশোরের শার্শা উপজেলার রায়পুর-বাহাদুরপুর ইউনিয়নের সোনামুখো বিলের সজনের ঘেরে ২১ আগস্ট(শুক্রবার) রাত আনুমানিক ১টার সময় ভয়াবহ মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে পাবদা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মারা গেছে। খামার মালিকদের দাবি, এতে তাদের প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ নষ্ট হয়েছে।

ঘেরটির মালিক এ এফ মৎস্য খামার। যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন। আকস্মিক এ বিপর্যয়ে তারা এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। খামার মালিকদের দাবি, মাছ চাষের জন্য বাজারের বিভিন্ন খাদ্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার খাদ্য বাকিতে নেওয়া হয়েছে। মাছ মারা যাওয়ায় সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা তারা।

খামার মালিক আলফাজুল হক জানান, ঘেরে বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিল। এসব মাছের একটি বড় অংশ বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রাত থেকে ঘেরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার কারণে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা আরও কমে গেলে মাছ মারা যেতে শুরু করে।

তিনি বলেন, “মার্কেট থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মাছের খাদ্য বাকিতে নিয়েছি। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা এখন কীভাবে এই ঋণ পরিশোধ করব, কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াব—কিছুই বুঝতে পারছি না।”

অপর খামারি ফারুক হোসেন বলেন, “আমরা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছি। হয়তো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না। আমাদের এই খামারের ওপর প্রায় একশ পরিবার নির্ভরশীল। রাত ১টার পর থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেনের ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায়। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সকাল হতে না হতেই বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছ মারা যায় এবং পচতে শুরু করে।”

স্থানীয় বাজারদর যাচাই করে খামারিরা জানান, বর্তমানে পাবদাসহ মাছের বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে ভালো। খামারের মাছের বড় অংশ বাজারজাত করা সম্ভব হলে বিপুল অর্থ পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু মাছ মারা যাওয়ায় সেই সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেছে।

খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, এ খামারে উৎপাদিত পাবদা মাছের একটি অংশ রপ্তানি চেইনের মাধ্যমে ভারতে যায়। ফলে এ ধরনের মাছ চাষ শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণই করে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি খামারটির আয়-রোজগারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় একশ পরিবার জড়িত।

ঘের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানিতে মৃত মাছ ভেসে রয়েছে। কোথাও কোথাও মাছ পচতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ মুহূর্তের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামার মালিকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

খামার মালিকদের অভিযোগ, রাত থেকে এখন পর্যন্ত শার্শা উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা থানা পুলিশের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে তাদের খোঁজখবর নেননি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

খামার মালিকদের প্রশ্ন এত বড় ক্ষতির পর তারা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন? মাছের খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া কোটি কোটি টাকার বকেয়া কীভাবে পরিশোধ করবেন? তাদের মতে, সরকারি সহযোগিতা না পেলে এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও মাছ চাষ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং মাছের মৃত্যুর পরিমাণ কত—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও অক্সিজেন সংকটে কোটি কোটি টাকার মাছ হারিয়ে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে এ এফ মৎস্য খামারের দুই উদ্যোক্তা। তাদের সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়েছে খামারের ওপর নির্ভরশীল প্রায় একশ পরিবার।